সর্বশেষ সংবাদ

আজ ডাকসুর ভোট, অনিয়ম হলেই দুর্বার আন্দোলন!

ঢাকা ঃ অনেকেই এখানে সেখানে ঘোরাঘুরি করছেন। এর ভেতরে ভোটারের কাছে কাছে গিয়ে জড়িয়ে ধরে প্রার্থীদের ভোট চাওয়ার দৃশ্য আপনার চোখে আটকাবে। এ ছাড়াও কে কাকে ভোট দিবে, কে হচ্ছেন দীর্ঘ ২৮ বছর পর নবনির্বাচিত ভিপি, জিএস, এজিএস সেই অঙ্ক তো ক্যাম্পাসের ইটপাথরে মিশে গেছে। রোববার রাতে পুরো ক্যাম্পাসজুড়ে বিভিন্ন স্থান ঘুরে এ রকম আবহ এবং আলোচনা শোনা গেছে। এই হচ্ছে রোববার সন্ধ্যা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের চিত্র।

চারিদিকে ভোটের কড়া হিসাব-কিতাব চলছে, ২৮ বছর পর আজ সোমবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এই নির্বাচন নিয়ে তুমুল প্রতিযোগিতার চিন্তা করছে ছাত্রলীগ, বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ, বামপন্থীদের প্যানেল প্রগতিশীল ছাত্রঐক্য এবং স্বতন্ত্রসহ অন্য প্যানেলের প্রার্থীরা। তবে সাধারণ শিক্ষার্থীরা বলছেন, মূলত লড়াইটা হবে কোটা সংস্কার আর ছাত্রলীগের ভেতরে।

তবে প্রগতিশীল ছাত্রঐক্যের ভিপি প্রার্থী ও ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক লিটন নন্দী একটু ভারি মনোভাব নিয়েই বললেন, ‘দেখা যাক কাল হয়তো সব ইকুয়েশন বদলে যেতে পারে। অনিয়ম হলে কোনো রকম ছাড় হবে না। ভালো কিছুই হোক সেই আশা প্রকাশ করছি। না হলে অন্দোলন হবে কঠোর।’

কিন্তু বিজয় ছাড়া ভাবতে চাইছে না বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ মনোনীত ভিপি প্রার্থী নুরুল হক নুর। তিনি বলেন, ‘ভোট সুষ্ঠু হলে ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয় পাব আমরা। আর ভোটে কোনো ধরনের অনিয়ম করে জেতার চেষ্টা করলে ভোট বাদ দিয়ে কাল থেকেই বিশাল এক আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটবে এই বাংলাদেশে। ভোট বাদ দিয়েই সকাল থেকেই আন্দোলন গড়ে তুলব।’

ছাত্রলীগের ভিপি প্রার্থী ও কেন্দ্রীয় সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন আবার বলেন, ‘সংখ্যাগরিষ্ঠতায় ছাত্রলীগ কিন্তু উপরেই। হলের অধিকাংশ ভোট কিন্তু তাদেরই। ভোট সুষ্ঠু হোক, তবু আমরা জিতব। এখানে কোনো সন্দেহ নেই।’

পুরো ক্যাম্পাস ঘুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তাঁরা জানান, কাল (আজ) ভোট। দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ভোট। খুব আগ্রহ নিয়ে তারা অপেক্ষা করছেন সকাল হওয়ার। এখনো পর্যন্ত যে পরিবেশ দেখছেন তাতে মনে হচ্ছে, ভোট সুষ্ঠু হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা আছে। তবে ছাত্রলীগ যে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করতে পারে সেই ভয় তো আছেই। তাছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভোট ডাকাতি বা কারচুপি করে কতটা সফল হওয়া যাবে সেই প্রশ্নও আছে সবার ভেতরে।

এদের ভেতরে শফিকুল ইসলাম নামের সূর্যসেন হলের এক শিক্ষার্থী এনটিভি অনলাইনকে বলেন, ‘ভোটের হিসাব বেশ জটিল। কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীরা অনেকের ভোট পাবেন। সদ্য ভূমিষ্ঠ হওয়া কোটা বাতিল তো আছেই। অনেক ছাত্রলীগের ভোটও কিন্তু তারা পাবে। তবে পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের আট হাজার পদধারী নেতা আছে বিভিন্ন কমিটিতে। এই ভোট বাইরে যাওয়ার সুযোগ কম। হলে একক আধিপত্য তো আছেই। কিন্তু কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় হলের ছাত্রীদের ওপর নির্যাতন কিন্তু মেয়েরা ভুলে যায়নি। ছেলেদের হলের তুলনায় মেয়েদের হলে কিন্তু ছাত্রলীগের ভোট কম। এদিকে বাম জোটের একটা ভোট ব্যাংক কিন্তু আছে। এছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সমর্থক কিন্তু কম না। দেখা যাক। তবে আমার কেন জানি মনে হয়, ভোট সুষ্ঠু হলে বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ জিতে যাবে। অন্য প্যানেল থেকেও হয়তো নির্বাচিত হতে পারে।’

সাজু আহমেদ নামের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘ভোট সুষ্ঠু হবে বলে মনে করছি। এরপরও প্রশাসন কী ভূমিকা নেয় সেটা দেখার বিষয়। মারামারি হামলা হবে না সেটাও ভাবতে পারছি না। আমি ভালো প্রার্থী যে দলেরই হোক না কেন ভোট দিব তাঁকে। সব দল থেকেই নির্বাচিত হোক।’

বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ মনোনীত ভিপি প্রার্থী নুরুল হক নুর বলেন, ‘ভোটে কোনো রকম অনিয়ম হলে আমরা দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলব। ক্যাম্পাসের নির্বাচনকে সংসদ নির্বাচন ভাবলে ভুল হবে। এখানে অনিয়ম করে কোনোভাবেই পার পাবে না কেউ। কঠোর আন্দোলন হবে। সেটা কাল থেকেই। আর সুষ্ঠু ভোট হলে তো কথা নেই। আলহামদুল্লিলাহ। ভোট ডাকাতি হলে ছাত্রলীগ বাদে সব দল মিলে কঠোর আন্দোলনে যাব আমরা। সেই চুক্তি আমাদের সবার সাথেই করা হয়ে গেছে। দেখা যাক, কাল কী হয়।’

ছাত্রলীগের তো আট হাজার পদধারী নেতাই আছে সারা ক্যাম্পাসের বিভিন্ন পদে। তাদের তো অনেক ভোট, কী মনে করছেন- এমন প্রশ্নে নুর বলেন, ‘আমিও তো ছাত্রলীগের পোস্টেড নেতা। আরো অনেক পোস্টেড নেতা কিন্তু আমাদের সাথে আছে। সেই ভোট তো আমরা পাব। আমাদের অনেক ভোট।’

ডাকসু নির্বাচনে পোলিং এজেন্ট থাকছে না

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচনের আচরণবিধিতে পোলিং এজেন্টের বিষয়টি উল্লেখ থাকলেও এই নিয়ম মানছে না নির্বাচন কমিশন। ফলে নির্বাচনে কারচুপি হওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন প্রার্থীরা।

এ বিষয়ে প্রধান রিটার্নিং কর্মকর্তা অধ্যাপক ড. এস এম মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘সব আমাদের নিয়ম করা আছে। এসব বিষয় আমাদের হলের নির্বাচনী কর্মকর্তারা দেখবেন।’

এদিকে ডাকসুর আচরণবিধির ১১-এর (খ) ধারায় পোলিং এজেন্টের বিষয়টি উল্লেখ আছে। এর আগে নির্বাচনী পোলিং এজেন্ট রাখার দাবিও জানায় ছাত্র ইউনিয়ন।

এ ব্যাপারে জহুরুল হক হলের রিটার্নিং কর্মকর্তা অধ্যাপক মো. হুমায়ুন কবির জানান, পোলিং এজেন্ট থাকবে না। পোলিং অফিসার থাকবে, উনারা সব কিছু করবেন।

এ ব্যাপারে ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক লিটন নন্দী বলেন, ‘নির্বাচনে পোলিং এজেন্ট থাকার বিষয়ে নিয়ম থাকলেও আমাদের কিছুই জানানো হয়নি। সব হলেই আমাদের পোলিং এজেন্ট প্রস্তুত আছে। পোলিং এজেন্ট না থাকলে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না বলে মনে করছি। পোলিং এজেন্ট না থাকলে জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে।’

একই অভিযোগ ডাকসুর স্বাধিকার স্বতন্ত্র পরিষদের জিএস প্রার্থী ও ঢাবি সাংবাদিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক এ আর এম আসিফুর রহমান এবং কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের সংগঠন বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ সমর্থিত প্যানেলের এজিএস প্রার্থী মো. ফারুক হোসেনের।

এদিকে আচরণবিধির ১১ এর (খ) ধারায় উল্লেখ আছে- নির্বাচনী কর্মকর্তা-কর্মচারী, প্রার্থী, পোলিং এজেন্ট, রিটার্নিং অফিসার কর্তৃক অনুমোদিত ব্যক্তি ব্যতীত অন্য কেউ ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করতে পারবে না। ভোটকেন্দ্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা তাঁদের নির্ধারিত স্থানে অবস্থান করবেন।

ডাকসু নির্বাচন : হলগুলোতে চলে গেছে অস্বচ্ছ ব্যালট বাক্স

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচনের অস্বচ্ছ ব্যালট বাক্স ও ব্যালট পেপার পাঠানো হয়ে গেছে। আজ রোববার বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে প্রধান রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে এগুলো বিভিন্ন হলে নিয়ে যান দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকরা।

নির্বাচনের প্রধান রিটার্নিং কর্মকর্তা অধ্যাপক ড. এস এম মাহফুজুর রহমান বিষয়টি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ভোটের আগের রাতে অনেক কাজ থাকে। তাই সামগ্রিক বিষয় নিয়েই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এর আগে নিরাপত্তা নিয়ে বিভিন্ন সংগঠনের উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে নির্বাচনের দিন সকালে ব্যালট বাক্স ও ব্যালট পেপার পাঠানোর সিদ্ধান্ত জানিয়েছিলেন নির্বাচন কমিশনার। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত ভুলে গিয়ে আজ বিকেল থেকে সিনেট ভবন থেকে ব্যালট বাক্স ও ব্যালট পেপারগুলো বিভিন্ন হলে নিয়ে যান দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকরা।

এর প্রতিবাদে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীরা বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামানের কার্যালয় ঘেরাও করেন ছাত্রদল, কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের সংগঠন বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ, বামপন্থীদের প্যানেল প্রগতিশীল ছাত্রঐক্যসহ বেশ কয়েকটি প্যানেলের প্রার্থীরা। তারা ভোটের দিন সকালে ব্যালট বক্স পাঠানোসহ সাত দফা দাবি জানিয়ে উপাচার্যের কাছে স্মারকলিপি দেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচনের অস্বচ্ছ ব্যালট বাক্স ও ব্যালট পেপার আজ রোববার বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে প্রধান রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে বিভিন্ন হলে নিয়ে যান দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকরা। ছবি : স্টার মেইল

দাবিগুলো হলো-১. সবার ভোট গ্রহণের বাস্তব পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে ভোট গ্রহণের সময় আরো চার ঘণ্টা বাড়ানো; ২. নির্বাচনকেন্দ্রিক শঙ্কা ও ধূম্রজাল নিরসনের লক্ষ্যে সব ধরনের মিডিয়ার কেবল পোলিং বুথের অভ্যন্তর ছাড়া নির্বাচনী এলাকা ও ভোটকেন্দ্রের সব তথ্য সংগ্রহের অবাধ সুযোগ তৈরি করা; ৩. ভোটকেন্দ্রে ভোটারদের আসতে নিরুৎসাহিত করাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা; ৪. স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স ব্যবহার ও পোলিং এজেন্ট নিয়োগের অনুমতি প্রদান; ৫. নির্বাচনী পর্যবেক্ষক ও ভোটারদের নিরাপত্তা বিধানে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা গ্রহণ; ৬. প্রতিটি কেন্দ্রে সকালবেলা ব্যালট পেপার নেওয়া এবং ৭. ভোট গ্রহণের দিন সকালবেলা সব রুটে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসের সংখ্যা বৃদ্ধি করা।

দীর্ঘ ২৮ বছর পর আগামীকাল সোমবার সকাল থেকে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচন। এতে মোট ভোটার সংখ্যা ৪৩ হাজার ২৫৫ জন। মোট কেন্দ্র ২৮টি। ‍বুথ থাকছে মোট ৫১১টি। কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদে মোট ২৫টি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ২২৯ জন প্রার্থী। আর ১৮টি হল সংসদের ১৩টি করে পদে লড়ছেন ৫০৯ জন প্রার্থী।

প্রতি মুহুর্তের খবর পেতে আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*